Koch 1024x577

সাভারের আদীম জনগোষ্ঠী

কোন এলাকার মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বলতে গেলে সেই এলাকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পর্বে সাভার ও আশেপাশের এলাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে (অনেকের মতে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার বছর আগে) হিমালয়ের উত্তর-পূর্ব দিকের তিব্বতের একাংশ হতে মানুষের একটা দল ব্রহ্মপুত্রের তীর বরাবর ভাটির দিকে যাত্রা শুরু করে। এদের একটা দল বার্মার উত্তরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে থিতু হয়। আরেকটা দল বর্তমান ভারতের অরুণাচল প্রদেশ থেকে শুরু করে মেঘালয়ের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মানব ইতিহাসে এই মানুষগুলোই একসময় তিব্বতীয়-বার্মিন জাতি হিসেবে পরিচিতি পাবে। এদেরই একাংশ পরবর্তীতে, প্রায় চার থেকে ছয় হাজার বছর আগে উত্তর ভারতের উচ্চভূমি থেকে বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের পাহাড়ী অঞ্চল, টাঙ্গাইল ও জামালপুরের কিছু অঞ্চল ও মধুপুরের গড় এলাকায় বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে এরা বিভিন্ন ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে যায়। এদেরকেই আমরা মূলত কোচ ও গাড়ো হিসেবে চিনি।

আজ থেকে প্রায় সত্তর হাজার বছর আগে একদল মানুষ পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে সিনাই উপত্যকার পাশ দিয়ে ইয়েমেনের পূর্ব উপকূলে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে তারা আরব সাগরের তীর ঘেঁষে চলতে চলতে বর্তমানের ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার হয়ে পারস্য উপসাগরের তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলে চলে আসে। পরবর্তীতে তারা ভারতীয় উপকূল ধরে আসতে আসতে আজ থেকে প্রায় পঁয়ষট্টি হাজার বছর আগে এসে পৌঁছায় আজকে আমরা যেটাকে বাংলাদেশ হিসেবে চিনি সেই এলাকায়। বাংলাদেশের ফেনী নদীর তীর ঘেঁষে, ফেনী, নোয়াখালী পার হয়ে তারা আরাকান হয়ে বার্মার উপকূলে এসে পৌঁছায়। পরবর্তীতে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া হয়ে পঞ্চাশ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে তারা থিতু হয়ে পরবর্তীতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ভারত মহাসাগরীয় অনেক অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ইতিহাসে এটাই “দ্যা গ্রেইট হিউম্যান মাইগ্রেশন” নামে পরিচিত। এই মানুষগুলোই একসময় অস্ট্রোএশিয়াটিক জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পায়।

আফ্রিকা থেকে মানুষের যে গ্রুপটি বাংলাদেশ হয়ে অস্ট্রেলিয়া যায়, তারাই মূলত এই ভূখণ্ডে প্রথম মানব পদচিহ্ন রেখে যায়। এদের পরে তিব্বতিয়-বার্মিন জনগোষ্ঠীই হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী যারা এই ভূখণ্ডে প্রথম মানব বসতি স্থাপন করে। এদের মধ্যে কোচ জনগোষ্ঠী সর্বপ্রাচীন। ভারতের কুচবিহার রাজ্যে এরা মধ্যযুগে রাজ্য স্থাপন করে এবং নিজেদেরকে এরা রাজবংশী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, আজকের প্রায় পুরো ঢাকা জেলা, টাংগাইল, মির্জাপুর ও জামালপুরের অংশবিশেষ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার অংশবিশেষ, শীতলক্ষ্যার তীর ঘেঁষে নারায়ণগঞ্জের অংশবিশেষ, পুরো মধুপুর ও গাজীপুর জেলা, এবং বংশী ও ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষে পুরো সাভার উপজেলার সম্মিলিত আয়তন প্রায় সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটার। এই সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাই মধুপুর গড়ের আওতাধীন। এর মধুপুর অংশের নাম মধুপুর গড় ও গাজীপুর অংশের নাম ভাওয়াল গড়। কিন্তু ভূতাত্ত্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী এর পুরো অংশই মধুপুর গড় নামে পরিচিত। উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চল, কুমিল্লার লালমাই পাহাড় এবং মধ্য বাংলাদেশের মধুপুর ট্র্যাক্ট হলো বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন তিনটি হিউম্যান সেটেলমেন্ট। আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার করা প্রয়োজন, সেটা হলো হিউম্যান সেটেলমেন্ট ও হিউম্যান সিভিলাইজেশন কিন্তু এক কথা নয়।

যাই হোক, এর মধ্যে গারোদের সাথে সাভারের সম্পর্ক অনেক প্রাচীন। আর্য আগমনের আগে এই অঞ্চলের আদিবাসী মূলত গারো ও কোচ সম্প্রদায়। গারোরা নিজেদের “আচিক মন্ডে” (পাহাড়ের আত্মা) হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করে। গারো পরিচয়টি তাদের জন্য অসম্মানের। এদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতের সাথে এরা মাছ, মাংস, শাকসবজি, মাশরুম, কঢি বাঁশের কন্দ আহার করে। শুঁটকি মাছ, বিশেষ করে চ্যাপা শুঁটকি এদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। না’কাম বিচি নামের এক ধরনের শুঁটকি মাছ স্যুপ এদের সংস্কৃতির একটি বিশেষ খাবার। গারোদের খাবারের আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হলো অত্যধিক কাঁচা মরিচের ব্যবহার। এদের রান্নার একটা কমন উপাদান হলো সোডা। প্রায় প্রতিটি তরকারিতেই এরা সোডা মিশিয়ে রান্না করে থাকে। আচিক মন্ডে জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ডেলিকেসি হল শুকরের মাংস, কুচে, কাঁকড়া ও কচ্ছপ। এদের অনেকে শুকর প্রতিপালন করে থাকে। ওয়াইন মেকিং এদের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ।

সাভারের রাজাশন, ধরেন্ডা, দেওগাও, কমলাপুর ও কালিয়াকৈর এলাকায় আজও এরা বিদ্যমান। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে খ্রিষ্টান মিশনারিদের দ্বারা এরা খ্রীষ্টধর্মে দিক্ষিত হয়। আমার ধারনা এরা পর্তুগীজ মিশনারি দ্বারা ব্যাপ্টাইড হয়েছিল। কারণ এদের নামের সাথে ডিকস্তা, রোজারিও, ডি সিলভা, ডিসুজা পদবীগুলো মূলত পর্তুগিজ পদবী। এদের অনেকের সাথে ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি। বড়দিনে অনেকের আতিথ্য গ্রহণ করেছি। এরা এখন পুরোদস্তুর বাঙালি সমাজের সাথে একান্তভাবে মিশে গেছে। খাবার দাবারেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পোলাও, খিচুড়ি, বিরিয়ানির মতো খাবার এখন এদের বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে উপভোগ করা হয়।

অন্যদিকে কোচরা চতুর্দশ শতাব্দীতে সংঘটিত হয়ে কুচবিহারে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করে এবং এরা নিজেদের নামের শেষে রাজবংশী উপাধি ব্যাবহার করা শুরু করে। হান্টার গ্যাদারার থেকে এরা ধীরে ধীরে অন্যান্য পেশায় চলে আসে। এদের বড় একটা অংশ মৎস্য শিকারে আত্মনিয়োগ করে। সাভারের পোড়াবাড়ী, গোপীনাথপুর, কর্ণপাড়া, ঋষিপাড়া ও ফুলবাড়িয়ার রাজবংশী পরিবারগুলো সেই প্রাচীন কোচ জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত। সেন শাসনামলে এরা ব্যাপকভাবে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হয় অত্যাচারিত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ রাজবংশীই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এরাও পুরোপুরি মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মূলধারার কোচরা শুঁটকি মাছের প্রচন্ড ভক্ত। বিভিন্ন উৎসবে এরাও শুঁটকি মাছের স্যুপ পরিবেশন করে থাকে।

এতো কথা বলার কারণ হলো, ২৬০০ বছর পূর্বে এদেশে আর্যদের আগমনের পূর্বেও সাভার ও আশেপাশের অঞ্চলে মানব বসতি ছিল। এরা কোন সভ্যতা হয়তো সৃষ্টি করতে পারেনি। কিন্তু সেই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন সময়ে সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানব বসতির অস্তিত্ব কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *