Oliva 1024x576

সাভারের মানুষের খাদ্যাভ্যাস

সাভারের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। প্রতিটি ঋতুর কিছু ইউনিক খাবার এখানকার মানুষের খাদ্য তালিকায় শত শত বছর ধরে বিদ্যমান আছে।

এই সময়টার কথাই ধরা যাক। এখন চলছে হেমন্তকাল। নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বছরের এই সময়ে সাভারের মোটামুটি যেকোনো পাড়ায় ঢুকলে অনভ্যস্ত মানুষ নাকে রুমাল চাপা দিত শুঁটকি মাছের গন্ধে। আশ্বিন মাসের শেষের দিকে যখন খাল বিলের পানি কমতে শুরু করতো, তখন এই এলাকায় মাছের বন্যা বয়ে যেত। প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে খেপা জাল বা ঝাঁকি জাল একটা আবশ্যকীয় বিষয় ছিল। বংশী নদীতে কি পরিমান মাছ ছিল তা এখানকার স্থানীয় মানুষ ছাড়া কেউ বিশ্বাস করবে না। দুইজন মানুষ গামছা দিয়ে মাত্র আধঘন্টা মাছ ধরলেই একবেলা খাওয়ার মাছ হয়ে যেত। যাই হোক, এখানকার ছেলে বুড়ো সবাই মাছ ধরত। আশ্বিন মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হতো মাছ ধরার উৎসব। হরেক রকম মাছ। ট্যাংরা পুঁটি থেকে শুরু করে রুই কাতলা বোয়াল, সবধরনের মাছে বাড়িঘর ভরে যেত। সব মাছ তো আর খেয়ে শেষ করা যেতো না, তাই প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মাছ শুঁটকি করে ফেলা হতো। কুঁচো চিংড়ি থেকে শুরু করে রুই কাতলা শোল গজার পর্যন্ত সব ধরনের মাছের শুঁটকি করা হতো এখানে। বড় বড় জার ও মটকা ভরে ভরে এই শুঁটকি সংরক্ষণ করে চৈত্র বৈশাখ মাস পর্যন্ত খাওয়া হত।

কার্তিক অগ্রাহায়ন হলো সাভারের মানুষের মাছ খাওয়ার সময়। ধামসোনা ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বংশী নদীর তীর ঘেঁষে শিমুলিয়া, নলাম, হাজীপুর, রহিমপুর, নয়ারহাট হয়ে পুরো পাথালিয়া ইউনিয়নের পর পোড়াবাড়ী বক্তারপুর পার হয়ে সাভার বাজারের পরে ঘোষপাড়া, দক্ষিণ পাড়া হয়ে ভাগলপুর, কাতলাপুর কর্ণপাড়া, কালীনগর, ঋষিপাড়া, ফুলবাড়িয়া হয়ে ঝাউচর ও একদম শেষের উয়াসপুর পর্যন্ত একই চিত্র পাওয়া যেত। সবাই মাছ শুকাতে ব্যাস্ত।

এই সময়ে খেত খামারে নতুন শীতকালীন সবজি ওঠা শুরু করে। তাই খাবারের মেন্যুতে নতুন সবজি, মাছ ও ঘরে তৈরি শুঁটকি এখানকার মানুষের এই ঋতুর খাবারের মূল উপকরণ। প্রায় প্রতিটি তরকারীতেই ধনেপাতা অবধারিত ভাবে থাকবে। নতুন আলু, ফুলকপি ও ধনেপাতা দিয়ে ঝোল ঝোল করে রুই কাতলা মাছের তরকারি কিংবা আলু, শিম ও ধনেপাতা দিয়ে বড় বড় দেশী পুঁটি মাছের রসা তরকারি। লাউ ও ধনেপাতা দিয়ে শোলমাছ রান্না করে রাতে রেখে দেয়া হতো সকালের নাস্তায় মুড়ি দিয়ে খাওয়ার জন্য। হেমন্তের শেষের দিকে মটরশুটি চলে আসতো। এবং এই সময়টায় বোয়াল মাছের শরীরে তেল হয়। নতুন আলু ধনেপাতা ও মটরশুটি দিয়ে কষানো বোয়াল মাছের তরকারি হলে ভাতের সাথে আর কিছুই লাগে না।

একসময় সাভারের আশুলিয়া জুড়ে দেশী লাল মুলার আবাদ করা হতো। উৎকৃষ্ট লাল মুলার আরও একটা জায়গা ছিল কোটবাড়ি। লাল মুলার সাথে ধনেপাতা কিংবা নতুন আলু, বেগুন ও ধনেপাতা দিয়ে রান্না করা ঘরে তৈরি শুঁটকি মাছের তরকারীর কোন তুলনা হয় না। এখনকার বেশিরভাগ মানুষই জানে না, সাভারে একসময় প্রচুর জলপাই হতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় জলপাই এর বাগান ছিল বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক ঘিরে থাকা জমেত আলী বেপারীর জলপাই বাগান। বড় বড় চমচমের মতো জলপাই ধরতো বাগানের কিছু কিছু গাছে। যাই হোক, সরিষা দিয়ে ফোড়ন দেয়া জলপাই দিয়ে দেশী পুঁটি মাছের খাট্টা এই অঞ্চলের মানুষের একটা অত্যন্ত প্রিয় খাবার।

এই এলাকার মানুষের রসনায় ভর্তা একটা অন্যতম উপকরণ। হেমন্তকাল হল ভর্তা খাওয়ার অন্যতম সেরা সময়। কারণ এসময়ে হরেক রকম মাছ ও নতুন শাকসবজি পাওয়া যায়। ভর্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধনেপাতাও এই সময়টায়তেই ওঠে। চিংড়ি, টাকি, বেলে, নলা, ঘরে তৈরি শুঁটকি, বিভিন্ন ধরনের শাক সবজি দিয়ে ভর্তা খাওয়ার প্রচলন আছে সাভারের মানুষের ফুড কালচারে। এই সিজনে সবচেয়ে মজাদার হলো চোখে জ্বালা ধরা ঘানির সরিষার তেল ও ভাজা শুকনো মরিচ দিয়ে বিলের সাদা চিংড়ির হাতে চটকে তৈরি করা ভর্তা। গরম গরম ভাত আর এই ভর্তা হলে আর কি চাই?

ক্ষুদের ভাত এই এলাকার মানুষের একটা গুরুত্বপূর্ণ ডেলিকেসি। এখানকার স্থানীয় মানুষের বাড়িতে প্রায়ই, বিশেষ করে ছুটির দিনে সকালের নাস্তায় ক্ষুদের ভাত ও বাহারী রকমের ভর্তা খুবই কমন খাবার। হেমন্ত ও শীতকালে ক্ষুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায় এখানে।

এই ঋতুতেই ঘরে ঘরে উঠে যায় আমন ধান। বংশী নদীর উভয় তীর ছিল আমন ধানের বিশাল আবাদভূমি। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আমন ধান কাটার সময় শুরু হতো। সাভার জুড়ে একটা উৎসব উৎসব ভাব চলে আসতো। কৃষিভিত্তিক সমাজে ফসল মানেই টাকা। তাই ধান ওঠার পরপর মানুষের মধ্যে উৎসব আয়োজনও বেড়ে যেতো। সার্কাস, হাউজি, মেলা খেলা মূলত ফসল কাটার পর শুরু হয়। এটাই সারা বাংলাদেশের চিত্র। সাভার ও আশেপাশের অঞ্চলে চাষাবাদের বছর শুরু হয় কার্তিক মাস থেকে। আর কার্তিক-অগ্রাহায়নের নতুন ফসলকে কেন্দ্র করে সারা বাংলায় শুরু হয় নবান্নের উৎসব। সাভারও এর ব্যাতিক্রম নয়। পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যেত নতুন ধান ওঠার সাথে সাথে। পিঠার ক্ষেত্রে চিতই পিঠা, দুধ চিতই, ভাপা পিঠা, তেলের পিঠা, কুলি পিঠা, পাটিশাপটা, ছিদরুটি, রুটি পিঠা এখানকার মানুষের সবচেয়ে পছন্দের। দুধ গুড় ও নারকেল জ্বাল দিতে দিতে ঘন ক্ষীরসা তৈরি করে সেই ক্ষীরসা দিয়ে তৈরি হতো ভাপা পিঠা ও পাটিশাপটা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দুচারটি করে খেজুর গাছ ছিল। পাঁচ দশ কেজি গুড় খেজুরের রসের সিজনে প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে তৈরি করে রাখা হতো মুড়ি বা খই দিয়ে মাখিয়ে কিংবা দুধ দিয়ে খাওয়ার জন্য।

হেমন্তের মাঝামাঝি সময়ে, যখন হালকা ঠান্ডা পড়তে শুরু করে, তখন সাভারের স্থানীয় মানুষের মাসকলাই এর ডাল খাওয়া শুরু হয় এবং এটা চলে মোটামুটি ফাল্গুন মাসের শেষ অবধি। এখানকার মাসকলাই ডালের ভ্যারিয়েশন লিখে শেষ করা যাবে না। মাছ, মাংস, সবজি দিয়ে কিংবা এককভাবে শুধু মাসকলাই এর ডাল এখানকার মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কুলখানি বা চেহলাম সাভারে ‘খরচ’ নামে পরিচিত। খরচের খাবারের মধ্যে ভাতের সাথে সবজি ভাজি, মাংস, দই তো থাকবেই, সেই সাথে মাসকলাই এর ডাল না হলে তো সেটা খরচই হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *