গল্প – ১
সময়টা ৮৫০ সালের দিকে। ইথিওপিয়ান কোস্টলাইন বরাবর কাফ্ফা নামের একটা জায়গা ছিল। পশুপালন ও চাষাবাদ ছিল এখানকার মানুষের প্রধান কাজ। খালদি বা খালিদ নামের এক ছাগলের রাখাল একদিন খেয়াল করলো একটা বিশেষ ঝোপের উজ্জ্বল লাল, হলুদ রঙের ফল খাওয়ার পর তার ছাগলগুলো খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে। খালদি ঝোপ থেকে কয়েকটি ফল নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেললো। এর কিছুক্ষণ পর সে খেয়াল করল, তার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত ভাললাগা কাজ করছে। খালদি এই অদ্ভুত গাছের কিছু পাকা ফল সাথে নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা দিল।
গ্রামের মধ্যে একটা মসজিদ ছিল। এই মসজিদটি মূলত সুফী ঘরানার লোকদের দ্বারা পরিচালিত হতো। খালদি তার ছাগলগুলোকে ঘরে দিয়ে, দ্রুত চলে গেল মসজিদের দিকে। ততক্ষণে সন্ধ্যা জেঁকে বসেছে। ইমাম সাহেবকে খালদি মসজিদের ভেতরেই পেয়ে গেল। কাছে গিয়ে খালদি পুরো ঘটনাটা ইমাম সাহেবকে খুলে বললো এবং ফলগুলো ইমাম সাহেবের হাতে দিল। ইমাম সাহেব মসজিদের কোনে জ্বেলে রাখা আগুনের আলোয় খুব ভালো করে ফলগুলো দেখলো। একটু চেখে দেখতে গিয়ে দেখল, এটা অত্যন্ত তিতা এবং বিস্বাদ একটা জিনিস। কোনভাবেই এটা মানুষের খাওয়ার উপযোগী নয়। আর এই ফলের মধ্যে নিশ্চয় শয়তানের কারসাজি আছে। নইলে এটা খাওয়ার পর ছাগল ও খালদির মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে কেন। এই কথা বলে ইমাম সাহেব পাশে জ্বলা আগুনের ভাড়ের মধ্যে ফলগুলো ফেলে দিল। কয়েক মুহূর্ত পরে এক অদ্ভুত মৌ মৌ গন্ধে পুরো ঘর ভরে উঠল। গন্ধেই একটা চনমনে ভাব চলে এলো ঘরের সবার মধ্যে। ইমাম সাহেব তারাতাড়ি নির্দেশ দিলেন আগুন থেকে পোড়া পোড়া বীজগুলো রক্ষা করতে। কিছু পোড়া বীজ রক্ষা করে একটা বাটিতে নিয়ে তারা দ্রুত গরম পানি ঢেলে দিল যাতে এর সুবাস উবে না যায়।
তারা খেয়াল করল পানি ধীরে ধীরে কালচে হয়ে উঠছে এবং ঘরময় সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে। ইমাম সাহেব গরম গরম জিনিসটা চেখে দেখলেন এবং সবাইকে নির্দেশ দিলেন চেখে দেখতে। ঘরের সবাই খেয়াল করল পানীয়টি খাওয়ার পরই তাদের মধ্যে একটা ভালোলাগার বোধ জেগে উঠেছে। পরবর্তীতে তারা আবিস্কার করল, এই পানীয়টি তাদের ধ্যানে মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে, এর প্রভাবে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকা যায় এবং রাত জেগে অনেক জটিল বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা যায়।
গল্প – ২
ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। ইয়েমেনের পশ্চিম প্রান্তে লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন বন্দর নগরী। নাম তার মোকা (Mocha)। এই শহরেই থাকেন শেখ ওমর। সুফী ভদ্রলোক। দোয়া দরুদ, ঝাড়ফুঁক এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রোগাক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা করতেন। যেকোন কারনেই হোক, তাকে কিছু দিনের জন্য মোকা থেকে ওউসাব (ইয়েমেনের যাবিদ শহর থেকে ৯০ কিলোমিটার পূর্বে) নামের মরুময় একটা জায়গায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। ক্ষুধায় কাতর হয়ে ওমর একটা ঝোপের ডালে ঝুলে থাকা লাল ফলগুলো চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু প্রচন্ড তিক্ত স্বাদের জন্য ব্যর্থ হয়। আগুনে ভেজে নিলে হয়তো তেতো স্বাদ কিছুটা কমবে, এই ভাবনা থেকে সে ফলগুলো ভেজে দেখে, সেগুলো শক্ত হয়ে গেছে। এরপর নিরুপায় হয়ে ভাজা ফলগুলো সে পানিতে সেদ্ধ করা শুরু করে। সেদ্ধ করতে গিয়ে শেখ ওমর খেয়াল করল যে ধীরে ধীরে পানির রং গাঢ় বাদামী হয়ে ওঠছে। উপায়ান্তর না দেখে ঐ পানিটাই সে খেয়ে ফেলল। এরপর সে লক্ষ্য করলো তার শরীর সতেজ হয়ে উঠছে এবং সে আর ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে না। কয়েকদিন পর এক আরব কাফেলা মোকা শহরে খবর নিয়ে যায় যে শেখ ওমর এক অদ্ভুত পানীয় খেয়ে মরুভূমির মধ্যে বেঁচে আছে। এরপর মোকা শহরের গভর্ণর শেখ ওমরকে মরুভূমি থেকে ডেকে পাঠান এবং ক্ষমা করে দেন। বাকি জীবন শেখ ওমর সুফী সাধক হিসেবে কাটিয়ে দেন।
উপরের দুটো ঘটনার কিছু কমন ফ্যাক্টর আছে। যেমন, দুটো ঘটনার স্থান লোহিত সাগরের একটা বিশেষ অংশের মুখোমুখি দুই তীর, দুটো ঘটনার সাথে সুফী সাধকদের সম্পর্ক রয়েছে এবং দুটি ঘটনাই মূলত একই বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। বিষয়টা আসলে কিছুই না, পানির পর পৃথিবীর সর্বাধিক গ্রহনীয় পানীয়, আমাদের অতি পরিচিত কফি। ইথিওপিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে শুরু করে উত্তরে ইরিত্রিয়া ও দক্ষিণে সোমালিয়ার গালফ অফ এডেনের তীরবর্তী অঞ্চল এবং লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূল ঘেঁষা ইয়েমেনের মোকা শহর – এই অঞ্চলই যে কফির আদি নিবাস – এতে কোন সন্দেহ নেই। মোটামুটি ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত কফির একচেটিয়া ব্যবসা ছিল আরবদের দখলে এবং ইয়েমেনের মোকা বন্দরই ছিল সবচেয়ে বড় কফির হাব। এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা কফির উৎপাদন এখানেই হয় এবং বিখ্যাত “ক্যাফে মোকা” টার্মটি এখান থেকেই এসেছে।
ষোড়শ শতাব্দীতে বাবা বুদান নামের এক ভারতীয় সুফী সাধক ইয়েমেন থেকে ৭ টি কফি বীজ নিয়ে ভারতের মহিশূরে চলে আসেন এবং ৭টি বীজ থেকে চারা উৎপাদন করেন। এই ৭ টি গাছই হলো লোহিত সাগর অঞ্চলের বাইরে কোথাও প্রথম কফি গাছ। এখান থেকেই পর্তুগিজ ও ভেনিশিয়ান ট্রেডারদের মাধ্যমে ইউরোপে কফি প্রবেশ করে। এরপর আস্তে আস্তে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, জাভা, সুমাত্রা, শ্রীলঙ্কা, কলম্বিয়া, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, ল্যাতিন আমেরিকা ও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে কফি ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও অতি সম্প্রতি কফির চাষ শুরু করা হয়েছে।
সারা পৃথিবীতে পানীয় হিসেবে কফির মূল দুইটি জাতকেই বেছে নেয়া হয়েছে। ক্যাফে এ্যারাবিকা ও ক্যাফে রোবাস্টা। স্বাদে গন্ধে ও ফ্লেভারের দিক দিয়ে ক্যাফে এ্যারাবিকা সেরা, কিন্তু এতে ক্যাফেইনের মাত্রা কম। অন্যদিকে আপনি যদি স্বাদের তোয়াক্কা না করেন, আপনি যদি ‘কফি মানেই ক্যাফেইনের কিক” টাইপের কফিখোর হোন, তাহলে রোবাস্টা আপনার জন্য। অনেকে ৬০/৪০, ৫০/৫০ বা নিজের ইচ্ছেমত এ্যারাবিকা ও রোবাস্টার ব্লেন্ড তৈরি করে নেয়। এধরণের স্বাধীনতা মনে হয় কফি ছাড়া অন্য কোন পানীয় দিতে পারে না।
আজ থেকে হাজার খানেক বছর আগে আরবরা যেভাবে কফি খেতো, কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া এখনো ঠিক সেভাবেই কফি খাওয়া হয়। অন্তত মূল প্রিন্সিপাল অবিকৃতই আছে। কফি গাছ থেকে পাকা কফি ফল তোলার পর কফির কাপে চুমুক দেয়া পর্যন্ত কিছু সাধারণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ডিশেলিং, ড্রাইং, রোস্টিং, গ্রাইন্ডিং ও ব্রুইং। কাচা কফি বীজকে রোস্টিং এর মাধ্যমে এর স্বাদ নিয়ে আসা হয়। বিভিন্ন মাত্রার রোস্টিং-এ কফির ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যায়। লো ইনটেনসিভ লাইট রোস্টিং থেকে শুরু করে হাই ইনটেনসিভ ফ্রেঞ্চ রোস্ট- সবই ভিন্ন ভিন্ন কাস্টমার ক্লাসকে মাথায় রেখে করা হয়। এর মধ্যেও ভাগ আছে, যেমন- সিঙ্গেল সোর্স ও মাল্টি সোর্স। সিঙ্গেল সোর্স কফি সাধারণত একই ভ্যারাইটির এবং একই ভৌগলিক এলাকা থেকে সংগৃহীত। একই উৎস থেকে সংগৃহীত হওয়ায় এর স্বাদ ও গন্ধ সবসময় অবিকৃত থাকে এবং এটাই প্রিমিয়াম কফির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে বহু উৎস থেকে সংগৃহীত কফির স্বাদ ও গন্ধ সবসময় একরকম থাকে না এবং এগুলো দিয়েই মূলত তৈরি করা হয় সস্তা ইনস্ট্যান্ট কফি। কফি বীজ রোস্ট করে গ্রাইন্ড করার পর, তা একটা বিশাল কেতলিতে জ্বাল দিতে দিতে পানি শুকিয়ে ফেললে শুকনো আলকাতরার মতো একটা পদার্থ হবে। সেই কালো পদার্থকে ক্রমান্বয়ে ডিহাইড্রেট করে তৈরি হয় ড্রাই কফি স্টোন। এই ড্রাই কফি স্টোনকেই ক্রাশ করে তৈরি করা হয় ইনস্ট্যান্ট কফি। স্বাদ কনসিসট্যান্ট রাখতে এর সাথে যোগ করা হয় নানান রকম কেমিক্যাল ও প্রিজারভেটিভ। ইনস্ট্যান্ট কফি খাওয়া আর কমলালেবুর বদলে ভিটামিন সি ট্যাবলেট খাওয়া একই কথা।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে সাভারে দু’একটা জায়গা ছাড়া কোথাও সত্যিকারের কফি পাওয়া যায় না। সর্বত্রই সস্তাদরের ইনস্ট্যান্ট কফি ব্লেন্ডার কিংবা হাই এয়ার প্রেশার মেশিনের মাধ্যমে ফেনা তুলে বিক্রি করছে। মাঝে মাঝে ফেনার উপর হালকা কোকো পাউডার ছিটিয়ে দিয়ে একটা মোকা মোকা ভাব আনার চেষ্টা করে সার্ভ করা হচ্ছে। যে কফি বানাতে ৩০ টাকাও খরচ হয় না, তা ক্ষেত বিশেষে ২৫০ টাকা দিয়েও আমরা কিনে খাচ্ছি ও তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি।
বাংলাদেশের কিছু অনলাইন শপে সত্যিকারের হোল বীন এবং গ্রাউন্ড কফি পাওয়া যায়। আপনি যদি সত্যিকারের কফির সমঝদার হোন, তাহলে ওখান থেকে কফি কিনে নিয়ে বাড়িতে ব্রু করে খেতে পারেন। ৫০০/১০০০ টাকার মধ্যেই এখন মোকা পট পাওয়া যায়। এটা দিয়ে আপনি বাড়িতেই চমৎকার এসপ্রেসো তৈরি করে নিতে পারবেন। আর এসপ্রেসো হলো সমস্ত কফির মাদার কফি। এসপ্রেসোর সাথেই বিভিন্ন মাত্রায় দুধ, ক্রীম ও পানি মিশিয়ে তৈরি হয় কাপুচিনো, ফ্র্যাপাচিনো, ক্যাফে লাটে, ক্যাফে আমেরিকানো, এ্যাফোগাতো, ফ্লাট হোয়াইট- আরও কত কি। তাও যদি না থাকে তাহলে সিম্পল চায়ের ছাকনি দিয়েই কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। কফি ব্রুইং এর অসংখ্য প্রসেস আছে। ইউটিউবে এসংক্রান্ত ভূরি ভূরি ভিডিও আছে। দেখে নিতে পারেন। এখানে রেস্টুরেন্টে কফি কালচার সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তাতে কি। আপনার পরিবার থেকেই শুরু করতে পারেন। জার্নি টু কফি একটা চরম এক্সাইটিং জার্নি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই জার্ণি আপনার খারাপ লাগবে না। নিজের হাতে কাচা কফি বীজ বিভিন্ন মাত্রায় রোস্ট করে, সেটা গ্রাইন্ড করা, এবং নিজের হাতে ব্রু করে কফি খাওয়ার মধ্যে যে মজা – এটা অন্য কোন কিছুতে পাবেন না। এটা একটা অন্য ধরনের সাইন্টিফিক এক্সপিডিশনও বলা যায়। নিজের পরিবার ও সন্তানদের সাথে চমৎকার সময় কাটানোর এটা একটা অসাধারন উপায়।
কফির রহস্যময় জগতে আপনাকে স্বাগতম।

