সাভারের ফুড কালচার এর অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে সাভারের দই-মিষ্টির অবস্থান। আর দই মিষ্টির সবচেয়ে পুরোনো দোকান হলো নিতাই চান ঘোষের দোকান। নিতাই চান, মোহন চান হয়ে কালাচান হলো তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাবসা। আর সাহা সুইটমীট, যেটাকে সবাই কালি সাহার মিষ্টির দোকান বলে জানি, সেটা এখন চালাচ্ছেন কালি মোহন সাহার ছেলে প্রলয় কুমার সাহা- অর্থাৎ এটা দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাবসা। দুটি দোকানই আজ পর্যন্ত সুনামের সাথে তাদের ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাভার সাবরেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে গোবিন্দ ঘোষ, কার্তিক ঘোষ ও সুবোধ ঘোষের তিনটি মিষ্টির দোকান আজও ব্যাবসা করে যাচ্ছে। এর মধ্যে গোবিন্দ সুইটমীটের রসগোল্লা ও সন্দেশ এক সময় খুব নাম করেছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এর পাশে যোগেশ ঘোষ ব্যাবসা শুরু করেন। মূলত যোগেশই প্রথম এখানকার ট্র্যাডিশনাল রসগোল্লা, চমচম ও লালমোহন এর বাইরে এসে রাজভোগ, মোহনভোগ, রসকদমের মত মিষ্টির বিপনন শুরু করে।
দই মিষ্টির কথা বললে নয়ারহাট বাজারের কথা না বললেই নয়। নয়ারহাটের জনতা সুইটমীট এর দই এর সুখ্যাতি সারা সাভার জুড়ে। কিন্তু সাভারের স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে শোনা যাবে ঘুঘুদিয়ার কেশব ঘোষের (কেশা) দই এর কথা। যেকোন সামাজিক অনুষ্ঠানে কেশব ঘোষের দই ছাড়া চলতই না। কেশব ঘোষ মারা গেছেন অনেকদিন। তার নাতি এখনো তার দাদার ব্যাবসা ধরে রেখেছে।
রাজফুলবারিয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকে ডিপজল ভাইয়ের বাগান বাড়ি ছেড়ে আরেকটু সামনে গেলেই হাতের বামে একটা অতি প্রাচীন মিষ্টির দোকান ছিল। এই দোকানে শুধুমাত্র রসগোল্লা তৈরী করা হতো। সকাল দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে সব মিষ্টি শেষ হয়ে যেতো। আমার জীবনের সেরা রসগোল্লা মূলত এই দোকান থেকে খাওয়া। উৎকৃষ্ট মিষ্টি দই ও ঘী এর আরেকটা জায়গা ছিল শিমুলিয়া বাজার। এখানকার সবচেয়ে নামকরা মিষ্টি ছিল কালোজাম। শিমুলিয়া থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় খাঁটি ঘী সরবরাহ করা হতো।
সাভার এলাকার দই এর একটা নিজস্বতা আছে। টাঙ্গাইল কিংবা বগুড়ার দই এর মতো এতো মিষ্টি না। একটু টক টক ভাব থাকে এখানকার ট্র্যাডিশনাল দই-এ। বড় গৃহস্থ পরিবারগুলো নিজেরাই দই পেতে খেত। বাজারের কেনা দই অনেকেই পছন্দ করতো না দইয়ে ননী কম থাকতো বলে। দই খাওয়ার পর যদি হাতে দইয়ের ক্রীম না লেগে থাকে, হাত ধুতে যদি সাবানই না লাগে, তাহলে সেটা দই হলো নাকি।
এখানে সন্দেশ পাওয়া যায় দুই ধরনের। সারা বছর পাওয়া যায় চিনির সন্দেশ। একটু শক্ত। মুখে বেশি নিলে গলা দিয়ে নামতে চায় না। শীতে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি হয় গুড়ের সন্দেশ। গরম গরম ঘীয়ে ভাজা পরোটা গুড়ের সন্দেশ দিয়ে খেয়ে দেখতে পারেন। আপনি এই নাস্তার প্রেমে পড়ে যাবেন। ৯৬/৯৭ সালের দিকে চৌরঙ্গী সুপার মার্কেটের নীচ তলায় গোবিন্দ সুইটমীট প্রথম প্রথা ভেঙে তুলনামূলকভাবে কম মিষ্টিযুক্ত, নরম, রসালো সন্দেশ তৈরি শুরু করে। সন্দেশপ্রেমীরা ভালভাবেই গ্রহণ করেছিল গোবিন্দর ঐ সন্দেশ। কয়েক বছর পর মান আর ধরে রাখতে পরেনি গোবিন্দ।
দই মিষ্টির সব দোকানে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ছাড়াও পাওয়া যায় নিমকি, জিলেপি, আমিত্তি, সন্দেশ ও মাওয়া। এছাড়াও পুজায় পাবেন লাড্ডু, লবঙ্গ, ছানার পোলাও সহ আরও অনেক কিছু। সাভারের স্থানীয় মানুষের সকালবেলার প্রিয় নাস্তাগুলোর একটা চিড়া দই ও মিষ্টি। নামা বাজারে আজও পাওয়া যায়। যেকোন দিন সকাল বেলা গিয়ে ভরপুর দই-চিড়া-বসগোল্লা-লালমোহন দিয়ে নাস্তা সেরে আসতে পারেন। সকাল সকাল সুগার-রাশ খারাপ লাগবে না। সারা পৃথিবী মিষ্টি মিষ্টি হয়ে যাবে।

